আইসিটি এনাবল্ড সার্ভিসেস – সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

আইসিটি এনাবল্ড সার্ভিসেস – সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি পৃথিবীর দরিদ্র জনগোষ্ঠির জন্য খুলে দিয়েছে অপার সম্ভাবনার দুয়ার। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কৃষি বিপ্লব, শিল্প বিপ্লবের পর বর্তমান পৃথিবী নতুনতর এক বিপ্লবের মুখোমুখি হতে চলেছে যার নাম তথ্য বিপ্লব। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যদি এই শতাব্দীকে নতুন কোন নামে অভিহিত করা হয় তবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির শতাব্দী হবে তার জন্য উপযুক্ত।

একবিংশ শতাব্দীর গ্লোবালাইজেশনের যুগে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অন্যতম উপাদান হচ্ছে কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট । কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটের বদৌলতে পৃথিবী এখন গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে।বলা চলে পৃথিবী হাতের মুঠোয় নয় আঙুলের ডগায় চলে এসেছে। কম্পিউটার প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার এবং প্রয়োগ যে কোন অনুন্নত দেশকে উন্নত করতে অগ্রনী ভূমিকা পালনে সচেষ্ট। তাইতো বর্তমান বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে ”অপর্যাপ্ত তথ্য প্রবাহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অন্তরায়।” শ্লোগানের বাস্তবতা সকল উন্নত, অনুন্নত, উন্নয়নশীল দেশ নির্দ্ধিধায় স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে । তৃতীয় বিশ্বভুক্ত দেশ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে নোবেল বিজয়ী পাকিস্তানের পদার্থ বিজ্ঞানী অধ্যাপক আবদুস সালাম যথার্থই বলেছিলেন -”অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য বিশ্ব জ্ঞান ভান্ডারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে নিজেদের করায়ত্ব করা এবং কেবলমাত্র এর মাধ্যমেই তৃতীয় বিশ্বভুক্ত রাষ্ট্রগুলো উন্নত বিশ্বের শামিল হতে পারে।”

আজকে বিশ্বের সমস্ত উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশ ইনফরমেশন সুপার হাইওয়ে বা তথ্যের মহাসড়কে প্রবেশ করে চলেছে।কম্পিউটার ভিত্তিক তথ্য বিনিময়ের অপূর্ব এই ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে বিশ্বের তথ্য অবকাঠামো বা গ্লোবাল ইনফরমেশন ইনফ্রাষ্ট্রাকচার বা সংক্ষেপে জিআইআই।পৃথিবীর প্রায় সব ধরনের তথ্য ব্যবস্থা এই জিআইআই এর অন্তর্ভূক্ত হচ্ছে; তথ্যের এই মহা রাজপথে যার অবস্থান যত দৃঢ় হবে ঠিক সেই অনুপাতে তথ্য আর জ্ঞানের ভান্ডার চলে যাবে তার নিয়ন্ত্রণে ।

বর্তমান বিশ্বায়নে সারা পৃথিবী জুড়ে চলছে আইসিটির আউটসোর্সিংয়ের জোয়ার । আইসিটির উন্নয়নের ধারাকে অব্যহত রাখতে জন্ম নিয়েছে নতুনতর এক অর্থনীতি যার নাম জ্ঞান ভিত্তিক অর্থনীতি বা নলেজ ইকোনোমি। জ্ঞান ভিত্তিক অর্থনীতি বিকাশের সাথে সাথে আমেরিকা , ইউরোপ কিংবা বিশ্বের উন্নত দেশ গুলোতে প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে বিপুল পরিমান তথ্য প্রসেসিং বা প্রক্রিয়াকরনের।যার ফলশ্রুতিতে উন্নয়নশীল দেশ সমূহ আইসিটি এনাবল্ড সার্ভিসেস কে কাজে লাগিয়ে অর্জন করছে বিপুল পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা। শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন নয় এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে দেশের বিপুল সংখ্যক প্রশিক্ষিত বেকার দক্ষ জনগোষ্টী।

আইসিটি এনাবল্ড সার্ভিস কি?

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে যে সেবা প্রদান করা হয় তাই হচ্ছে আইসিটি এনাবল্ড সার্ভিস । উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ সহ উন্নত বিশ্ব তাদের বিপুল পরিমান তথ্য প্রসেসিং করার জন্য অপেক্ষা কৃত যে সকল অঞ্চল বা দেশে শ্রমের মূল্য কম অথচ সেবার মান উন্নত এমন দেশেই তারা কাজ পাঠাচ্ছে। ইতিমধ্যে আইসিটি এনাবল্ড সার্ভিসকে কাজে লাগিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে চলেছে। সময় হয়েছে, সুযোগ এসেছে, আর বসে না থেকে সমূহ সম্ভাবনাময় আইসিটি এনাবল্ড সার্ভিসেস কে কাজে লাগিয়ে শিক্ষিত বেকার জনশক্তিকে জাতীয় সম্পদে রুপান্তর করা সম্ভব। সাথে সাথে অর্জিত হতে পারে বিপুল পরিমানে বৈদেশিক মুদ্রা।

এবার জানতে চেষ্টা করি আইসিটি এনাবল্ড সার্ভিসেসের প্রধান প্রধান ক্ষেত্র গুলো কি? কারা এই সার্ভিসের উপযোগী? কিভাবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব?

মেডিক্যাল ট্রান্সক্রিপশন

মেডিক্যাল ট্রান্সক্রিপশন কি?

মেডিক্যাল ট্রান্সক্রিপশন এমন একটি পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ডাক্তার এবং হেলথ কেয়ার প্রফেশনালগন মেডিক্যাল রিপোর্ট ডিকটেট করেন। ডাক্তার বা স্বাস্থ্য কর্মী যে সকল সমস্যা সনাক্ত করে, সে সব সমস্যাকে যথাযথ ভাবে কোন রুপ পরিবর্তন ছাড়াই রিপোর্ট আকারে তৈরি করতে হয়। এই রিপোর্টের মধ্যে থাকে রোগীর ইতিহাস, স্বাস্থ্যগত রিপোট, ক্লিনিক্যাল রিপোর্ট, ডিসচার্জ রিপোর্ট, ল্যাবরেটরী রিপোর্ট ,এক্সরে রিপোর্ট ইত্যাদি। টেক্সটে রুপান্তরিত রিপোর্ট গুলো ভবিষ্যতে রেফারেন্স হিসেবে সংরক্ষিত থাকে যা পরবর্তীতে ডাক্তারদের প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত দেবার জন্য প্রয়োজন হয়।

কিভাবে কাজ করে?

 আমেরিকা বা ইউরোপে অবস্থানরত ডাক্তার ভয়েস রেকর্ডারে রোগীর মেডিক্যাল রিপোর্ট ডিকটেট করেন।
 এরপর ডাক্তারের ভয়েস বিভিন্ন দেশের একটি সেন্টাল কম্পিউটারে পৌঁছে দেয়।
 ভয়েস ডিজিটাল সিগন্যালে কনভার্ট হয়ে হাই¯পীড কমিউনিকেশন ডিভাইসের মাধ্যমে ট্রান্সমিট হয়।
 কমিউনিকেশন ডিভাইস থেকে গৃহীত ডাটা লিখিত আকারে ট্রান্সক্রাইবড করা হয়।
 কমিউনিকেশন ডিভাইসের মাধ্যমে ট্রান্সক্রাইভ্ড রিপোর্টকে ডিজিটাল হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে পাঠানো হয়।
 সেন্ট্রাল কম্পিউটারে প্রসেস করা ডাটা পরবর্তীতে প্রিন্টেড রিপোর্ট আকারে পৌঁছে।

যা জানা দরকার

 ইংরেজী গ্রামার, structure, style এসব বিষয়ের ভালো দখল থাকতে হবে।
 কম্পিউটার লিটারেসীতে দক্ষ হতে হবে।
 ওয়ার্ড প্রসেসিং, স্পেলিং ও প্রফ রিডিং এ দক্ষতা থাকতে হবে।
 দ্রুত গতিতে টাইপ করার ক্ষমতা থাকতে হবে।
 মেডিক্যাল সায়েন্সের টার্ম গুলো জানা থাকতে হবে।
 ল্যাংগুয়েজ অব মেডিসিন সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে।
 ভাল শ্রবন শক্তি সম্পন্ন হতে হবে এবং শ্রত শব্দ বোঝার ক্ষমতা থাকতে হবে।

আপনার মাসিক আয় কত হতে পারে?

আপনার পারিশ্রমিক নির্ভর করে কত গুলো বিষয়ের উপর যেমন, আপনি কি রকম কাজ করতে পারবেন ;কি পরিমান পারবেন, আপনার ক্লায়েন্ট কোন লেভেলের ইত্যাদি।
সাধারনত প্রতি লাইনের জন্য ৪ থেকে ১০ সেন্ট পর্যন্ত প্রদান করা হয় সেই হিসাবে আপনি মাসে ১০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ৪০,০০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন । তবে আপনার আয় নির্ভর করছে আপনার কাজের দক্ষতার উপর; এক্ষেত্রে আপনাকে প্রফ, রিডিং আর এডিটিং এর কাজটিও করতে হবে।

মেডিক্যাল ট্রান্সক্রিপশনের ভবিষ্যৎ

ক্যারিয়ার বিশেষজ্ঞদের মতে প্রতি বছর শুধু ভারতেই ২৫% হারে পেশাজীবি তৈরী হচ্ছে। এই খাতে ভারত ১০ বিলিয়ন ইউএস ডলার আয় করতে সক্ষম। এ সেক্টরে তাদের সুবিধাজনক অবস্থান থাকায় তারা প্রায় সাড়ে তিন লাখের বেশী কর্ম সংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে বলে আশাবাদী। ইতি মধ্যে মেডিক্যাল ট্রান্সক্রিপসন খাত ভারতে ৪র্থ বৃহৎ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন খাত হিসাবে পরিগনিত হয়েছে।

আমেরিকার মেডিক্যাল ট্রান্সক্রিপশন ইন্ডাষ্ট্রির পরিমান প্রায় ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মেডিক্যাল ট্রান্সক্রিপশন এর আউটসোসিং প্রতি বছর ২০% হারে বেড়ে চলেছে। বিশ্বে ৬৭০০ এর বেশী হাসপাতাল তাদের মেডিক্যাল রেকর্ড সমূহ অডিও থেকে টেক্সট ফরমেটে কনভার্ট করার জন্য আউট সোর্সে আগ্রহী।শ্রমের মূল্য কম হওয়ায় এবং আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় বাংলাদেশ এই সুযোগকে খুব সহজেই কাজে লাগাতে পারে।

কল সেন্টার

কল সেন্টারের কাজ কি?

বিশ্বের বড় বড় সেবা প্রদান কারী প্রতিষ্ঠান এবং উৎপাদন কারী প্রতিষ্ঠান গুলো সেবা ও পণ্যের বিক্রয়ের সেলস কলের জন্য কল সেন্টার ব্যবহার করতো । পরবর্তীতে শুধুমাত্র কল সেন্টার গুলোতে সার্ভিস রিকোয়েষ্ট গ্রহন করা হতো। বর্তমানে কল সেন্টার গুলোর প্রধান কাজ হচ্ছে কাষ্টমার সেলস এবং সার্ভিস। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ডেল পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতাদের কাছ থেকে পিসি (পারসনাল কম্পিউটার) আর সার্ভারের সেলস অর্ডার গ্রহন করে। এক্ষেত্রে টেলিফোন এজেন্টরা গ্রাহকের ফোন কলটি রিসিভ করে ডেলের অর্ডার প্রসেসিং সিস্টেমে গ্রাহক কর্তৃক সরবরাহ কৃত তথ্য টাইপ করে। এই অর্ডার গুলো পিসি প্রস্তুত করার পরবর্তী ম্যানুফাকচারের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর প্রোডাকশনের পর পিসি গুলো হোম ডেলিভারির মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। কোন সমস্যার সম্মুখীন হলে ডেল পিসির গ্রাহকগন সমাধানের জন্য একটি কল করতে পারে ডেল সাপোর্টে। আর ডেল কর্তৃপক্ষ গ্রাহকের বাসা থেকে পিসিটি নিয়ে যায় সমাধানের জন্য। একেই বলে গ্রাহক সেবা।

কারা এই পেশায় আসতে পারেন?

 যারা ইংরেজী বুঝতে এবং বলতে পারেন অকপটে।
 যারা ফোনে খুব দ্রুত উত্তর দিতে পটু।
 যারা দ্রুত ও নিভূলভাবে টাইপ করতে সক্ষম।
 নিয়মিত কর্মক্ষেত্রে আসার ব্যাপারে যাদের রয়েছে প্রচন্ড কর্ম স্পৃহা।
 কিছু কিছু ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পজিশনে MBA, CA, PHD, ENGINEERING ডিগ্রীর প্রয়োজন পড়ে তবে সাধারণ ক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষার তেমন কোন প্রয়োজন পড়ে না।

 

কল সেন্টার মার্কেটে প্রবেশ করতে যা করতে হবে

প্রথমে যে ব্যাপারটি নিশ্চিত করতে হবে তা হচ্ছে এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় কম খরচে মান সম্মত সেবা প্রদান করা। শুধু মাত্র শ্রমের মূল্য কম হলেই চলবে না সাথে সাথে ডিসট্যান্স কমিউনিকেশনের খরচাপাতি কমাতে পারলে এবং উম্মুক্ত করে দিলে অচিরেই এই সেক্টর থেকে প্রচুর পরিমানে ফরেন কারেন্সি আয় করা সম্ভব। অন্যদিকে সংস্থান হতে পারে উচ্চ বেতনে বিপুল পরিমানে শিক্ষিত বেকার যুবক যুবতীদের।

প্রি-প্রেস সার্ভিস

প্রি-প্রেস সার্ভিস কি?

প্রি-প্রেস হচ্চেছ প্রিন্টিং প্রেসে যাওয়ার পূর্ব মুহুর্তের কাজ। এই কাজ হতে পারে কোন বিজ্ঞাপনী সংস্থা, ছায়াছবির পোষ্টার, ব্রোশিয়ার , পণ্যের কাটালগ, বই, ম্যাগাজিন, কার্টুন, লেবেল ইত্যাদি প্রসেসিং এর কাজ। এক কথায় ছবি, টেক্সট ইত্যাদিকে একটি প্লাটফরমে সন্নিবেশ করার পদ্ধতি। কম্পিউটারে ডিজাইন , প্রিন্টারের মাধ্যমে প্রিন্ট করা, মেক আপ, গেট আপ, প্রফ রিডিং, পজেটিভ, পেষ্টিং, প্লেট তৈরি পর্যন্ত কাজ গুলোই হলো প্রি-প্রেস সার্ভিস। আসলে প্রিন্টিং প্রক্রিয়াকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমনঃ
১। প্রি-প্রেস ২। প্রিন্টিং (প্রেস) ৩। পোষ্ট প্রিন্টিং । একটু বিস্তারিত ভাবে বললে বলা যায় স্ক্যানিং থেকে শুরু করে ডেস্কটপ পাবলিশিং এর কাজ, ফিল্ম আউটপুট এবং প্রসেস ও প্লেট তৈরী করা ইত্যাদি কাজ গুলোই হলো প্রি-প্রেসের আওতাভূক্ত।
এই পেশায় প্রবেশের যোগ্যতা

এই পেশায় আসতে হলে আপনাকে ইলাষ্ট্রেশন ডিজাইন, ফটো এডিটিং, কালার সেপারেশন, স্ক্যানিং টেকনিক, ফিল্ম আউটপুট প্রসেসিং এবং এক্সপোজিং, প্রিন্টিং ইত্যাদি সম্পর্কে দক্ষ হতে হবে।

প্রি-প্রেস সফটওয়্যার কি?

প্রি-প্রেস কাজের জন্য যে সকল সফটওয়ার প্রয়োজন তার মধ্যে এডবি ফটোশপ, এডবি ইলাষ্ট্রেটর, এডবি ইন ডিজাইন, কোয়ার্ক এক্সপ্রেস, কোরেল ড্র, পেজ মেকার, ম্যাক্রোমিডিয়া ফ্রি হ্যান্ড, ফ্র্যাক্টাল ডিজাইন প্রভৃতি উল্লেখ যোগ্য।

প্রি-প্রেস সার্ভিসেস এবং বাংলাদেশ

দেশ এবং বিদেশে প্রি-প্রেস সার্ভিসের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রি-প্রেস সার্ভিসের উপর যেমন প্রচুর কাজ রয়েছে তেমন বাংলাদেশে তরুন প্রজন্মের আগ্রহ রয়েছে। এই সেক্টরের উপর এখনকার প্রি-প্রেস কোয়ালিটি বিশ্বমানের তাই সরকারী এবং বেসরকারী ভাবে এই সেক্টরের পৃষ্ঠপোষকতা করা হলে অচিরেই ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হতে পারে, ফলশ্রুতিতে বিপুল পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

টিভি এবং মুভির জন্য এনিমেশন তৈরী

আইসিটি এনাব্ল্ড সার্ভিসেসের মধ্যে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত হচ্ছে টেলিভিশন ও মুভির জন্য টুডি ও থ্রিডি এনিমেশন তৈরী করা। এই সেক্টরে বাংলাদেশের ছেলে মেয়েদের ভাল করার অন্যতম কারণ তারা জন্মগত ভাবে সৃজনশীল পরিবেশে গড়ে উঠেছে। এখানকার প্রত্যন্ত—অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে রূপ কথা, কল্প কথা, ঠাকুর মার ঝুলি ইত্যাদি জাতীয় নানা ধরনের কাহিনী। যার আলোকে এ দেশের মেধাবী তরুন প্রজন্ম তৈরী করতে সক্ষম টেলিভিশন ও মুভির জন্য চমৎকার সব এনিমেশন। এনিমেশনের কাজ করার জন্য আমাদের দেশের তথ্য প্রযুক্তিবিদের চেয়ে এদেশের চারুকলা শিল্পের ছাত্র/ছাত্রীরা বা এই বিষয়ে জ্ঞান লব্ধ শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত ভাল করতে পারে। এক্ষেত্রে যদি তাদেরকে উপযুক্ত প্রশিক্ষন দেওয়া হয় তবে নতুন নতুন কর্ম সংস্থানের সৃষ্টি হবে। বেকারত্ব ঘুচবে সর্বোপরি জাতীয় ভাবে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

ওয়েব/ ডিজিটাল কনটেন্ট ডেভলপমেন্ট সার্ভিস

আপনি আপনার পণ্যের প্রচার চান? ইন্টারনেট হতে পারে সারা বিশ্বকে আকৃষ্ট করার অন্যতম মাধ্যম। আপনার যা দরকার তা হলো একটি ওয়েব পেজ। আপনাকে আপনার পন্য বা প্রতিষ্ঠানের কনটেন্ট দিয়ে এই পেজ ডেভলপ করতে হবে। এই কাজ গুলো করিয়ে নেয়ার জন্য বিশ্বের বড় বড় নামকরা কোম্পানী বা প্রতিষ্ঠান উচ্চহারে সার্ভিস চার্জ প্রদান করে থাকে। তারা তাদের পন্যের প্রচারের জন্য ওয়েব কনটেন্ট ডেভলপ করে নিচ্ছে বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং দেশের কাছ থেকে।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশ এই সার্ভিসের জন্য উপযুক্ত স্থান কারণ এখানকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে সৃজনশীল বৈচিত্রময় কাজের প্রতি আগ্রহ বেশী, তারা মাল্টিমিডিয়ার কাজ শিখতে চায়; আগ্রহী ওয়েব সাইট ডেভেলপমেন্ট কাজের প্রতি। বাংলাদেশের দক্ষ তথ্য প্রযুক্তি পেশাজীবিদের যথার্থ প্রশিক্ষনের মাধ্যমে উপযুক্ত ওয়েব ডেভেলপার হিসাবে গড়ে তুলতে পারলে এই সেক্টর থেকে সরকার মাল্টি বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারে।

ব্যাক অফিস ওয়ার্ক

১১ই সেপ্টেম্বরের টুইন টাওয়ার ধবংসের পর থেকে আমেরিকা সহ উন্নত বিশ্বের বড় বড় কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান তাদের বিভিন্ন বিভাগের কাজ যেমন কর্মচারীদের নাম ঠিকানা, নোটিশ, বেতন কাঠামো, এমন কি হিসাব বিভাগ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রন করে দুরে থাকা তৃতীয় কোন প্রতিষ্ঠান। যার সাথে একটি আর্থিক চুক্তির আলোকে কাজ প্রদান করা হয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যেতে পারে কুরিয়ার ও পার্শ্বেল সেবা প্রদানকারী সংস্থা গুলোর কথা। ধরা যাক বিদেশ থেকে কোন পার্শ্বেল পাঠানো হলো এবং গ্রাহক তার পার্শ্বেলের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চায় এক্ষেত্রে সংস্থাটি নিজে এই কাজটি না করে অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তা করিয়া থাকে। এর মাধ্যমে গ্রাহক জানতে পারে তার পার্শ্বেলের অবস্থা কি।

ব্যাক অফিস ওয়ার্কের জন্য যা প্রয়োজন

প্রথমত প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবলের প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত উন্নত এবং দ্রুত সেবা প্রদান করা ও হাইস্পীড ইন্টারনেট কানেকশনের প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বাজারের অনেকাংশের কাজ বাংলাদেশও পেতে পারে। সুযোগ এসেছে, আর দেরী না করে ব্যাক অফিস ওয়ার্কের মাধ্যমে কোটি কোটি ডলার আয় করার এখনই মোক্ষম সময় । অর্থ আমাদের হাতছানি দিচ্ছে। প্রয়োজন শুধু সুষ্ঠ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা।

কম্পিউটার এইডেড ডিজাইন বা ইঞ্জিনিয়ারিং

কম্পিউটার এইডেড ডিজাইন বা ইঞ্জিনিয়ারিং কি?

বর্তমানে যে কোন ডিজাইন ও ড্রাফটিং তথা ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রায় প্রতিটি শাখায় ব্যবসারত কোম্পানি গুলো কমপিউটার প্রযুক্তির সাহায্যে তাদের ওয়ার্ক প্রেজেন্টেশন, স্ট্রাকচার এনালাইসিস প্রভৃতি কাজ গুলো করে থাকে। এই সার্ভিস গুলো হচ্ছে কমপিউটার এইডেড ডিজাইন বা ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস।

কাদের জন্য এই পেশা

এই পেশা তাদের জন্য যারা কর্মক্ষেত্রে অধিকতর গ্রহন যোগ্যতা, সম্মান ও সম্মানির কথা চিন্তা করে। যারা বুয়েট বিআইটি ও পলিটেকনিক সহ ইঞ্জিনিয়ারিং এর বিভিন্ন শাখায় পড়াশুনা শেষ করেছেন তাদের জন্য।

বিশ্ব বাজার এবং বাংলাদেশ

দক্ষ জনবল ও পেশাদারিত্বের অভাবে বিশ্বের উন্নত দেশ গুলোর ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি গুলো বিশ্ব বাজারে টিকতে না পেরে কাজ গুলো আউটসোর্সিং করছে। এ কাজ গুলো ভারত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং অগ্রসরমান অন্যান্য দেশ গুলো হতে করে নিচ্ছে। যথাযথ পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষনের মাধ্যমে পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ ও পেশাদার জনবল তৈরী করতে পারলে এদেশের মেধাবী দক্ষ ডিপ্লোমা ও গ্রাজুয়েট ইঞ্জিনিয়ারদের উচ্চ হারে বেতন প্রদান করে কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব। এর ফলে দেশের সম্পদ বা মেধা যেমন দেশেই থাকবে তেমনি বিপুল পরিমানে ফরেন কারেন্সি আয় করা সম্ভব।

সাব মেরিন কেবল এবং বাংলাদেশ

একটি দেশ কি পরিমান উন্নত তার সূচক হলো টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো। বর্তমান শতাব্দীতে টেলিযোগাযোগের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বিষয় হচ্ছে সাব মেরিন কেব্ল। শুধু টেলিযোগাযোগই নয়, আইসিটির উন্নয়নেও উচ্চ গতির প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। প্রায় দেড় দশক তটস্থ সময় কাটে বাংলাদেশের। অবশেষে ফাইবার অপটিক সাবমেরিন কেবলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ।

 

আমরা কি প্রস্তুত?

বাংলাদেশের আভ্যন্তরীন টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো কতটা শক্তিশালী ? বাংলাদেশ কি সারা দেশে ফাইবার অপটিক কেবলের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করতে পেরেছে? সাবমেরিন কেবল হয়ে আসা বিপুল পরিমান ব্যান্ড উইড্থের পরিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত কি করা সম্ভব হয়েছে? প্

আউটসোর্সিং-এ বাংলাদেশের সম্ভাবনার কারণ সমূহ

 ভৌগলিক ভাবে বাংলাদেশ এবং দক্ষিন এশিয়াস্থ দেশ গুলো ১২ ঘন্টা টাইম জোন এ অন্তর্ভূক্ত এর ফলে যখন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে রাত্রি তখন বাংলাদেশে দিন যার ফলে প্রায় ২৪ ঘন্টাই কাজ করার সুবিধা পাচ্ছে বাংলাদেশ।

 আমাদের রয়েছে বিপুল সংখ্যক প্রশিক্ষিত তথ্য প্রযুক্তিবিদ এবং ইংরেজী ভাষা জানা এক ঝাঁক উদ্দমী তরুন যারা ক্রমবর্ধনশীল চাহিদার সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম।

 বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশে শ্রমের বাজার মুূল্য অত্যন্ত কম। এখানকার শিক্ষিত বেকার জন শক্তি স্বল্প বেতনে উন্নত মানের সেবা প্রদান করতে সক্ষম। এক্ষেত্রে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে ভাল করতে পারে।যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ আমাদের গার্মেন্টস শিল্প।

 সাধারণত একটি ইন্ডাষ্ট্রি গড়তে যে পরিমানে বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে, আইসিটি এনাবল্ড সার্ভিসের যে কোন একটি সেক্টরে এর বিনিয়োগের পরিমান চার ভাগের এক ভাগ লাগবে।

 সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্র“তি মতে বেকার সমস্যার সমাধানে আইসিটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে যার ফলে বেকার দক্ষ জনশক্তিকে জাতীয় সম্পদে পরিণিত করা সম্ভব । অন্য দিকে দেশ প্রচুর পরিমানে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে।

 আইসিটি এর বদৌলতে প্রচুর পরিমানে টেলিকম খাত থেকে জাতীয় রাজস্ব আয় করা সম্ভব এবং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।

টার্গেট সেক্টর

 হাসপাতাল, ক্লিনিক,ডায়াগনস্টিক সেন্টার।
 প্রিন্টিং ইন্ডাষ্ট্রি।
 ইন্সুরেন্স কোম্পানী।
 ব্যাংকিং।
 ফিন্যান্সিয়াল ইন্সটিটিউশন।
 ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড ডিজাইনিং ফার্ম।
 নেভিগেশন কোম্পানী।
 লিগ্যাল ফার্মস।
 বৃহৎ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানী।
 এয়ার লাইন্স।

বিশ্বব্যাপী ইন্টিগ্রেটেড নলেজ ইকোনোমি বা সমন্বিত জ্ঞান ভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আর্শীবাদ বয়ে এনেছে। আইসিটি এনাবল্ড সার্ভিস কে কাজে লাগিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশ ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের কাজ করছে। বসে আছি শুধু আমরা! আমাদের শিক্ষিত বেকার দক্ষ জনশক্তি থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে হাত ছাড়া করছি মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা।কিন্তু আর নয়, আইসিটি এনাবল্ড সার্ভিস হতে পারে এদেশের বেকার যুবক-যুবতীদের মুখে প্রশান্তির হাসি , দেশ হতে পারে অর্থনৈতিক ভাবে শক্তিশালী, হতে পারে সমৃদ্ধি অর্জনের – সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত।

 

( আবু তৈয়ব রোকন, জাতীয় বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি সপ্তাহ ২০০৫, সরকারি আযিযুল হক কলেজ অবলম্বনে সম্পাদিত )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Visitor counter

Visits since 2016

Your IP: 54.198.15.20

Categories